প্রিন্ট এর তারিখ: জুলাই ৯, ২০২৬, ৮:৫১ এ.এম. || প্রকাশের তারিখ: জুলাই ৫, ২০২৬, ৯:৪২ পি.এম.

গোপালগঞ্জের বাকপ্রতিবন্ধী পত্রিকা বিক্রেতা জামিল, তিন দশকের সংগ্রামে আত্মনির্ভরতার অনন্য দৃষ্টান্ত

এম টি রহমান মাহমুদ, গোপালগঞ্জ প্রতিনিধিঃ

গোপালগঞ্জ শহরের পরিচিত মুখ জামিল শেখ। জন্মগতভাবে বাকপ্রতিবন্ধী হলেও প্রতিকূলতাকে হার মানিয়ে প্রায় ৩০ বছর ধরে পত্রিকা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। নিজের উপার্জনের মাধ্যমে পরিবারের দায়িত্ব পালন এবং অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার খরচ বহন করে আত্মনির্ভরতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ তৈরি করেছেন এই সংগ্রামী মানুষ।

গোপালগঞ্জ শহরের মিয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা জামিল শেখের বয়স প্রায় ৪০ বছর। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে না পারলেও মাত্র ১০ বছর বয়সে পত্রিকা বিক্রির পেশায় যুক্ত হন। সেই থেকে প্রতিদিন ভোরে শহরের বিভিন্ন এলাকায় সংবাদপত্র পৌঁছে দিয়ে জীবিকা অর্জন করছেন।

পুলিশ লাইনস, বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট, বিভিন্ন দোকান ও বাসাবাড়িসহ শহরের নানা প্রান্তে প্রতিদিনই দেখা মেলে তার। রোদ-বৃষ্টি কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়া কোনো কিছুই তার কর্মনিষ্ঠাকে থামাতে পারেনি। কথা বলতে না পারলেও ইশারা-ইঙ্গিতে ক্রেতাদের চাহিদা বুঝে দ্রুত পত্রিকা তুলে দেন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় হিসাব-নিকাশেও তিনি পরিচিত নির্ভুলতার জন্য।

তবে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের প্রসারের কারণে ছাপা পত্রিকার বিক্রি কমে যাওয়ায় আগের তুলনায় তার আয়ও কমেছে। তারপরও তিনি নিজের শ্রমের ওপর ভরসা রেখে জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।

স্থানীয় একটি পত্রিকা বিক্রয়কেন্দ্রের মালিক জানান, দীর্ঘ তিন দশক ধরে জামিল নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে কাজ করে আসছেন। তার বিরুদ্ধে কখনো আর্থিক অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ ওঠেনি।

স্থানীয় বাসিন্দারাও জামিলকে একজন সৎ, পরিশ্রমী ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করেন। বর্তমানে তার উপার্জনের ওপরই পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় এবং অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা নির্ভর করছে।

পরিবারের দাবি, একসময় জামিল সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতা পেলেও পরবর্তীতে তা বন্ধ হয়ে যায়। এতে সংসার পরিচালনা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

জামিলের মা শিরিয়া বেগম বলেন, ভাতা কেন বন্ধ হয়েছে তা তাদের জানা নেই। বর্তমানে ছেলের পত্রিকা বিক্রির আয়ই পরিবারের একমাত্র অবলম্বন।

এ বিষয়ে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা শারমিন আক্তার বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর প্রতিবন্ধী ভাতার তালিকা থেকে কাউকে বাদ দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি জানান, জামিল বা তার পরিবারের সদস্যরা জাতীয় পরিচয়পত্রসহ সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে রেকর্ড যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দীর্ঘ তিন দশক ধরে নিজের শ্রম, সততা ও আত্মসম্মানকে পুঁজি করে এগিয়ে চলা জামিল শেখ আজ অনেকের কাছে অধ্যবসায় ও আত্মনির্ভরতার এক অনুপ্রেরণার নাম।