এম টি রহমান মাহমুদ, স্টাফ রিপোর্টারঃ
গলায় ছোট একটি প্ল্যাকার্ড ঝুলছে। তাতে বড় অক্ষরে লেখা—“আমি আমার মাকে এবং ৮ মাসের ভাইকে মুক্ত করতে চাই।” কোনও স্লোগান নেই মুখে, হাতে কোনও ব্যানারও নেই। নির্বিকারভাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) অফিসের সামনে বসে রয়েছে আট বছরের জেরিন। তার একমাত্র চাওয়া—মা এবং ছোট ভাই যেন আবার বাড়িতে ফিরতে পারে।
বুধবার সকালে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসে গিয়ে দেখা যায়, প্ল্যাকার্ড গলায় ঝুলিয়ে ইউএনওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য অপেক্ষা করছে জেরিন। কিন্তু সেবার ইউএনও জেলা শহরে সরকারি কাজে ছিলেন, ফলে শিশুটির সঙ্গে দেখা হয়নি।
পারিবারিক সূত্র জানায়, শিশু জেরিনকে নির্যাতনের অভিযোগে গত ২০ মে কোটালীপাড়া থানা-পুলিশ তার সহমা আকলিমাকে গ্রেফতার করেছে। পরে আদালতের মাধ্যমে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। সেই সময় তাঁর সাথে রয়েছে সাত মাস বয়সী শিশু কন্যাও। এরপর থেকে পুরো পরিবার গভীর সংকটের মধ্যে চলছে।
জেরিন আবেগঘন কন্ঠে বলে, “মা জেলে যাওয়ার পর আমি খুব দুঃখ পাই। আমার ছোট ভাইটিও জেলে রয়েছে। সে তো কিছুই বুঝতে পারছে না। মা তার ভুল বুঝতে পেরেছেন। আমি চাই মা এবং আমার ছোট ভাই যেন বাড়ি ফিরে আসেন। আমরা সবাই একত্রে থাকতে চাই।”
জেরিনের বাবা মুন্না মোল্লা বলেন, “আমাদের পরিবার পুরোপুরি ভেঙে গেছে। সাত মাসের ছেলেটি জেলে বড় হচ্ছে, আর বাসায় তিন কলেজ মেয়ে মাকে ছাড়া দুঃখে দিন কাটাচ্ছে। আইনের প্রতি আমাদের পূর্ণ শ্রদ্ধা রয়েছে। তবে মানবিকভাবে বিবেচনা করে আদালত যদি জামিন দেয়, তবে আমাদের পরিবার আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে।”
স্থানীয় বাসিন্দা শাহানাজ বেগম বলেন, “জেরিনকে প্রায়ই মায়ের জন্য কাঁদতে দেখি। শিশুটির এই আকুতিও আমাদের খুব কষ্ট দেয়। আইন নিজস্ব গতিতে চলবে, তবে শিশুদের বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত।”
কোটালীপাড়া সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মনিরুজ্জামান শেখ জুয়েল বলেন,
“মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন। তাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার আদালতের। তবে সাত মাসের শিশু এবং মাকে ছাড়া বেড়ে ওঠা তিন কন্যাশিশুর বিষয়টি মানবিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থও নিশ্চিত করতে হবে।”
আইনের শাসন রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। একই সঙ্গে শিশু অধিকার ও মানবিক মূল্যবোধ একটি সভ্য সমাজের প্রধান দায়িত্ব। বিচার প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও, একটি আট বছরের শিশুর গলায় ঝোলানো ছোট প্ল্যাকার্ড যেন বড় প্রশ্ন তা তুলে ধরে—বিচার এবং মানবিকতার সমন্বয় কোথায়…?
জেরিনের কান্নার নদী কোনও আদালতের রায় নয়, কোনও আইনি যুক্তিও নয়। তবে এটি একটি শিশুর অন্তরের ভাষা, যে তার মায়ের কাছে ফিরে যেতে চায় এবং চায় তার সাত মাসের ভাই যেন পরিবারের স্নেহে বড় হতে পারে।
এখন একটাই প্রশ্ন—বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকার মধ্যে শিশুদের অধিকার সংরক্ষণের জন্য সমাজ, রাষ্ট্র এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ধরনের মানবিক পদক্ষেপ নিতে পারে…?
জেরিনের অসমর্থিত প্ল্যাকার্ডে লেখা কিছু শব্দ হয়তো কোনও রায়ের বিকল্প নয়, কিন্তু তা নিঃসন্দেহে আমাদের বিবেককে স্পর্শ করে এমন এক মানবিক আবেদন!