প্রিন্ট এর তারিখ: আগস্ট ৩১, ২০২৬, ৫:৪৯ পি.এম. || প্রকাশের তারিখ: আগস্ট ২৩, ২০২৬, ৪:০৫ পি.এম.

সাহিত্যের আয়নায় এক নতুন মুখ ‘শব্দতরী’

নিলয় রফিক

একটি সাহিত্যপত্রের জন্মকে কেবল একটি নতুন প্রকাশনার আত্মপ্রকাশ হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত তাৎপর্য অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়। একটি ভালো সাহিত্যপত্র আসলে তার সময়কে ধারণ করে—কখনো সরাসরি, কখনো প্রতীকে, কখনো স্মৃতির ভেতর দিয়ে, আবার কখনো ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তার স্বপ্নের মধ্য দিয়ে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ‘শব্দতরী’র প্রথম সংখ্যা পাঠ করতে গেলে এটিকে একটি নবীন সাহিত্যপত্রের চেয়েও বেশি কিছু বলে মনে হয়। এটি একই সঙ্গে নানা লেখকের কণ্ঠ, নানা অভিজ্ঞতার প্রতিধ্বনি এবং বাংলা ভাষার সমকালীন সাহিত্যচর্চার একটি বিস্তৃত কোলাজ।

জুলাই ২০২৬-এ প্রকাশিত ‘শব্দতরী’র প্রথম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা আয়তনে ৩২৮ পৃষ্ঠার। প্রথম সংখ্যার জন্য এই বিপুল আয়োজন নিঃসন্দেহে উচ্চাকাঙ্ক্ষী। তবে এর গুরুত্ব শুধু পৃষ্ঠাসংখ্যায় নয়; বরং বিষয় ও লেখক নির্বাচনের ব্যাপ্তিতে। কবিতা থেকে প্রবন্ধ, গবেষণামূলক নিবন্ধ থেকে ছোটগল্প, অনুবাদ থেকে ভ্রমণ, স্মরণগদ্য থেকে কাব্যচিন্তা—সাহিত্যের বিচিত্র প্রবাহকে একই মলাটের মধ্যে জায়গা করে দেওয়ার চেষ্টা এখানে স্পষ্ট।

এই বৈচিত্র্যই ‘শব্দতরী’র প্রথম সংখ্যার প্রধান পরিচয়ঃ

পত্রিকাটির সম্পাদক জিয়াউদ্দিন লিটন নিজেও কবিতা, প্রবন্ধ, সমালোচনা ও সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত। ফলে তাঁর সম্পাদনায় সাহিত্যকে শুধু নান্দনিকতার পরিসরে সীমাবদ্ধ না রেখে জীবন ও সমাজের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সামগ্রিক শিল্পচেতনা হিসেবে দেখার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। মানুষের প্রেম, বেদনা, স্মৃতি, স্বপ্ন, সামাজিক বাস্তবতা, ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের প্রতি যে আগ্রহ সংখ্যাটির বিভিন্ন লেখায় ছড়িয়ে আছে, তা সম্পাদকীয় দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

একটি সাহিত্যপত্রের শক্তি অনেকাংশে নির্ভর করে তার বিষয় নির্বাচনের ওপর। ‘শব্দতরী’র ক্ষেত্রে এই জায়গাটি বেশ সচেতন বলেই মনে হয়। প্রবন্ধ ও নিবন্ধ বিভাগে খৈয়াম কাদের, বেলাল হোসেন, আনোয়ার মল্লিক, আরিফ নজরুল, নাজিয়া ফেরদৌস, দেবব্রত নীল, আবু আফজাল সালেহ, সুমন শামস, সাকিল মাসুদ, তারেক আহসান, বঙ্গ রাখাল ও জিয়াউদ্দিন লিটনের উপস্থিতি পাঠককে সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন বিষয়ে ভাবার সুযোগ দেয়।

বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায় খৈয়াম কাদেরের ‘সাহিত্যে শ্লীলতা-অশ্লীলতা : মনস্তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ’ প্রবন্ধটি। সাহিত্যে শ্লীলতা ও অশ্লীলতার প্রশ্নটি নতুন নয়; কিন্তু বিষয়টির সঙ্গে মানবমন, যৌনতা ও নন্দনতত্ত্বের সম্পর্ককে আলোচনায় আনা প্রবন্ধটিকে একটি চিন্তাশীল বিতর্কের জায়গায় নিয়ে যায়।

ড. বেলাল হোসেনের বগুড়ার আঞ্চলিক সাহিত্যচর্চার ইতিহাসবিষয়ক রচনাটিও আলাদা গুরুত্বের দাবি রাখে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই বৃহত্তর কেন্দ্রের দিকে তাকাই; অথচ আঞ্চলিক সাহিত্যচর্চার ইতিহাসের ভেতরেই অনেক সময় একটি জনপদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের মূল্যবান দলিল লুকিয়ে থাকে। সেই দিক থেকে এ ধরনের অনুসন্ধান সাহিত্যপাঠকে আরও বিস্তৃত করে।

‘শব্দতরী’র আরেকটি শক্তিশালী দিক তার ঐতিহ্যচেতনা। প্রাচীন বাংলার ধাঁধা, লোকাচার এবং ময়নাপাগলকে ঘিরে অলৌকিকতার লোকবিশ্বাসের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে পত্রিকাটি আধুনিকতার সঙ্গে শিকড়ের সম্পর্কটিকে সামনে এনেছে। লোকসংস্কৃতিকে শুধু অতীতের স্মারক হিসেবে না দেখে বর্তমান সাংস্কৃতিক চেতনার অংশ হিসেবে পাঠ করা জরুরি। এই জায়গায় ‘শব্দতরী’র উদ্যোগ তাৎপর্যপূর্ণ।

তবে সংখ্যাটির সবচেয়ে বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে কবিতা।

এখানে কবিতার পরিমাণ যেমন উল্লেখযোগ্য, তেমনি কবিদের বৈচিত্র্যও চোখে পড়ার মতো। মাহমুদ কামাল ও আমিনুল ইসলামের দীর্ঘ কবিতা, শোয়েব শাহরিয়ারের গুচ্ছ কবিতা এবং খসরু পারভেজ, কামরুল হাসান, মজিদ মাহমুদ, বীরেন মুখার্জী, বাবুল আনোয়ার, ফজলুল হক তুহিন, মনসুর আজিজ, আযাদ কালাম, রমজান মাহমুদ, তৌফিক জহুর, নুসরাত সুলতানা, সৌহার্দ্য সিরাজ, উদাস আবদুল্লাহ, অচিন্ত্য চয়ন, মাহফুল আখতার, কাজী লুৎফুননেসা, নিলয় রফিকসহ বহু কবির একক কবিতা পত্রিকাটিকে একটি বৃহৎ কাব্যসম্ভারে পরিণত করেছে।

এই কবিতাগুলো একই স্বরের নয়—এটাই বরং তাদের বড় বৈশিষ্ট্য। কেউ ব্যক্তিগত প্রেম ও বিরহের দিকে গেছেন, কেউ স্মৃতি ও নিঃসঙ্গতার দিকে, কেউ প্রকৃতি ও নদীর কাছে ফিরে গেছেন, আবার কেউ সমাজ, যুদ্ধ, মানুষ ও অস্তিত্বের প্রশ্নকে কবিতার ভাষায় ধরেছেন।

তবে কবিতা বিভাগের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক সম্ভবত অন্যত্র। ‘শব্দতরী’ শুধু প্রতিষ্ঠিত বা পরিচিত কবিদের জন্য তার পৃষ্ঠা উন্মুক্ত রাখেনি; নতুন ও অপেক্ষাকৃত অপরিচিত কবিদেরও নিজেদের কবিসত্তা প্রকাশের সুযোগ দিয়েছে। একটি সাহিত্যপত্রের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত।

একজন প্রতিষ্ঠিত কবির কাছে একটি কবিতা প্রকাশ হয়তো তাঁর সাহিত্যিক যাত্রার স্বাভাবিক অংশ; কিন্তু একজন নতুন কবির কাছে একটি সাহিত্যপত্রে নিজের কবিতা প্রকাশ অনেক সময় আত্মবিশ্বাসের প্রথম সিঁড়ি। নিজের নামের পাশে নিজের কবিতা মুদ্রিত দেখতে পাওয়া তাকে আরও লিখতে, আরও পড়তে এবং নিজের ভাষা ও কাব্যভঙ্গি নিয়ে আরও গভীরভাবে ভাবতে উৎসাহিত করে।

‘শব্দতরী’র প্রথম সংখ্যায় নতুন কবিদের জন্য সেই পরিসর তৈরির প্রয়াসটি বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। কারণ সাহিত্যকে এগিয়ে নিতে শুধু প্রতিষ্ঠিতদের পুনরাবৃত্তি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নতুন কণ্ঠ আবিষ্কার করা। আজকের অপরিচিত তরুণ কবিই হয়তো আগামী দিনের গুরুত্বপূর্ণ কবি হয়ে উঠবেন। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে সামনে আনার জন্য প্রয়োজন প্রকাশের সুযোগ, সম্পাদকীয় আস্থা এবং পাঠকের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের একটি ক্ষেত্র।

এই অর্থে ‘শব্দতরী’র কবিতা বিভাগকে কেবল কবিতার সংকলন হিসেবে দেখলে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক অনালোচিত থেকে যায়। এটি একই সঙ্গে নতুন কবিদের উৎসাহিত করা, তাদের সাহিত্যচর্চায় ধরে রাখা এবং ভবিষ্যতের কবিসত্তাকে বিকশিত করার একটি প্রয়াস। অর্থাৎ পত্রিকাটি শুধু কবিতা ছাপতে চায়নি; কবিতার আগামী প্রজন্ম তৈরির ক্ষেত্রও নির্মাণ করতে চেয়েছে। একটি নবীন সাহিত্যপত্রের জন্য এমন দৃষ্টিভঙ্গি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

ছোটগল্প বিভাগে এসে পত্রিকাটি আবার অন্য এক জীবনভূমিতে প্রবেশ করেছে। রোকেয়া ইসলাম, নূরকামরুন নাহার, মোখলেস মুকুল, এলিজা খাতুন, মাহফুজা অনন্যা, নুর এম ডি চৌধুরী, সুলতান মাহমুদ রনি, সুশান্ত কুমার দে, ইসলাম রফিক, অনন্য রাসেল ও অমর কৃষ্ণ পাল নান্টু,বিশ্বজিৎ চৌধুরী রিবর্ণ’র গল্পে ব্যক্তি ও সমাজের নানা সম্পর্ক, জীবনসংগ্রাম, স্মৃতি এবং মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে।

ভ্রমণ ও স্মরণগদ্য সংখ্যাটিকে দিয়েছে আরও একটি মানবিক মাত্রা। ‘সবুজ দ্বীপের দিনলিপি : তেরো দিনে শ্রীলঙ্কা’ শুধু ভ্রমণের বিবরণ নয়; এমন রচনা পাঠককে অন্য ভূগোলের সঙ্গে পরিচিত করার পাশাপাশি নিজের পরিচিত পৃথিবীকেও নতুন চোখে দেখতে শেখায়। আর বাউলসাধক শাহ সুফি হাসান আলী চিশতিকে ঘিরে স্মরণগদ্য আমাদের লোকসাধনা, আধ্যাত্মিকতা ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির দিকে ফিরিয়ে নেয়।

অনুবাদ বিভাগও তাই আলাদা করে গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য। নগুগি ওয়া থিয়োং’ওর রচনা এলহাম হোসেন বাংলায় রূপান্তর করেছেন। একটি বাংলা সাহিত্যপত্রে আফ্রিকান সাহিত্যিকের উপস্থিতি শুধু বৈচিত্র্য সৃষ্টি করে না; বাংলা ভাষার পাঠককে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে সংযুক্ত করার একটি সাংস্কৃতিক দায়িত্বও পালন করে।

একইভাবে পশ্চিমবঙ্গের কবিদের অংশগ্রহণ সংখ্যাটির ভৌগোলিক পরিসরকে প্রসারিত করেছে। সৌমিত বসু, সুনীল মাজি, বিনীতা সরকার, সুবীর সরকার, শাশ্বত গঙ্গোপাধ্যায়, তৃষ্ণা বসাক, আবু রাইহান, রথীন পার্থ মণ্ডল, অরুণ কুমার দাঁ ও চিরঞ্জীব ভাণ্ডারীর কবিতা দুই বাংলার সাহিত্যিক যোগাযোগকে আরও দৃশ্যমান করেছে।

প্রশংসার পাশাপাশি কিছু প্রত্যাশাও থাকে। ৩২৮ পৃষ্ঠার এই বৃহৎ সংখ্যাকে ভবিষ্যতে আরও সংহত করতে লেখার নির্বাচনে কঠোরতা, সম্পাদনায় সূক্ষ্মতা ও প্রুফ সংশোধনে বাড়তি মনোযোগ প্রয়োজন। তবে এসব সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে ‘শব্দতরী’র প্রথম সংখ্যার সবচেয়ে বড় অর্জন তার ব্যাপ্তি ও সাহসী উদ্যোগ। নতুন ও প্রতিষ্ঠিত লেখকদের পাশাপাশি নবীনদের জন্য যে পরিসর তৈরি হয়েছে, তা আশাব্যঞ্জক। শব্দকে স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও স্বপ্নের বাহন করে ‘শব্দতরী’র এই যাত্রা আগামী সংখ্যাগুলোতে আরও পরিণত ও সমৃদ্ধ হবে—এটাই প্রত্যাশা।

প্রথম সংখ্যার সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো সেখানেই—‘শব্দতরী’ নিজেকে শেষ কথা হিসেবে হাজির করেনি; বরং একটি দীর্ঘ কথোপকথনের দরজা খুলেছে। সেই কথোপকথনে যেমন প্রতিষ্ঠিত কণ্ঠ আছে, তেমনি আছে নতুন কণ্ঠের প্রথম উচ্চারণ। আর কোনো সাহিত্যপত্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য এর চেয়ে আশাব্যঞ্জক সূচনা আর কী হতে পারে?

বাংলা সাহিত্যের সেই কথোপকথন আরও বিস্তৃত হোক, নতুন কবিরা আরও সাহস নিয়ে লিখুন, নতুন লেখকেরা তাঁদের নিজস্ব স্বর খুঁজে পান এবং ‘শব্দতরী’ তাঁদের সেই স্বর প্রকাশের একটি বিশ্বস্ত আশ্রয় হয়ে উঠুক—এই প্রত্যাশাই রইল।