মোঃ রেজাউল করিম, জেলা প্রতিনিধি, মাদারীপুরঃ
ক্রমেই বেড়ে চলেছে মানব পাচারকারী চক্র। সর্বস্বান্ত হয়ে ভিটেমাটি ছাড়া হচ্ছে সাধারণ মানুষ। জীবন দিতে হচ্ছে নিরীহ, অবুঝ যুবকদের—কেউ সাগর পাড়ি দেওয়ার সময়, কেউ শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে প্রাণ হারাচ্ছে। পরিবার হারাচ্ছে সন্তানকে।
মাদারীপুরে তেমনি একটি চক্র—এমদাদ দালাল গংদের বিরুদ্ধে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য, ভিডিও ফুটেজ ও অডিও বার্তা। ফুটেজগুলো দেখলে গা শিউরে ওঠে। ভুক্তভোগী আকলিমা জানান, মানব পাচারকারী চক্রের সদস্য এমদাদসহ এনামুল হক, লাভলু মাতুব্বর, বাবলু মাতুব্বর, ইঞ্জি বেগম (সর্ব পিতা: মজিদ মাতুব্বর), সুমা আক্তার (স্বামী: এমদাদুল মাতুব্বর), মেরাজ তালুকদার (পিতা: আব্দুর রাজ্জাক তালুকদার), সাং—রাম রানাদিয়া, ঘটমাঝি, মাদারীপুর; মজিবর বেপারী (পিতা: মৃত মদন বেপারী), সাং—কুকরাইল, সর্ব সং মাদারীপুর।
আমার বড় বোনের ছেলে মোহাম্মদ হাওলাদারকে ১৬ লক্ষ টাকার বিনিময়ে পর্তুগাল নেওয়ার কথা বলে এমদাদ দালাল পাসপোর্টের সঙ্গে ৫ লক্ষ টাকা নেন। পরবর্তী ৫/৬ মাস পরে পারমিটের কথা বলে আরও ৮ লক্ষ টাকা নেন এবং ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে আরও ১০ লক্ষ টাকা নেন—মোট ২০ লক্ষ টাকা। অতঃপর পর্তুগাল নিতে না পেরে তালবাহানা শুরু করলে আমরা টাকা ফেরত চাই। তখন এমদাদ দালাল বলেন, লিবিয়া হয়ে ইতালি পৌঁছে দেবেন। এজন্য আরও ২০ লক্ষ টাকা দিতে হবে। এতে আমরা রাজি হই এবং ২০ লক্ষ টাকা প্রদান করি।
লিবিয়ায় নিয়ে কাজ দেওয়ার কথা বলে এমদাদের স্ত্রী তানিয়া আক্তার ৩ লক্ষ টাকা এবং মেরাজ তালুকদার ও মজিবর বেপারী আরও ৪ লক্ষ টাকা নেন। টাকা নিয়ে আমার বোনের ছেলে মোহাম্মদ হাওলাদারকে লিবিয়ার মাফিয়াদের কাছে বিক্রি করে দেয়। মাফিয়ারা মর্মান্তিকভাবে শারীরিক নির্যাতন করে তার ভিডিও আমাদের মোবাইলে পাঠিয়ে মুক্তিপণ দাবি করে। বোনের ছেলেকে বাঁচাতে আমরা বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে ৩৬ লক্ষ টাকাসহ মোট ৬৬ লক্ষ টাকা প্রদান করি। তবুও শারীরিক নির্যাতন বন্ধ হয়নি। একপর্যায়ে আমার বোনের ছেলে বন্দী কক্ষের জানালা ভেঙে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
আমরা দালালদের কাছে জানতে চাইলে তারা বিভিন্ন ধরনের তালবাহানা ও গড়িমসি করে। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে আমরা আদালতে মামলা করি। এতে দালালরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে আমাদের প্রাণনাশের হুমকি দেয় এবং আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করে হয়রানি করে আসছে।
ভুক্তভোগী নুরজাহান বেগম জানান, আমার ছেলে নুর ইসলাম মাতুব্বরকে ২১ লক্ষ টাকার বিনিময়ে লিবিয়া হয়ে ইতালি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেন। আমরা সরল মনে রাজি হই এবং পাসপোর্টের সঙ্গে এমদাদ দালাল গংদের হাতে (এসমোতারা বেগম, মজিবর বেপারী, ফুলি বেগম ও পপি আক্তার) ১৫ লক্ষ টাকা দিই। কিছুদিন পরে দুবাই নিয়ে লিবিয়ার কথা বলে আরও ৫ লক্ষ টাকা নেন। লিবিয়ায় আমার ছেলেকে কোনো কাজ না দিয়ে মাফিয়ার কাছে বিক্রি করে দেয়। মাফিয়ারা নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে আমার কাছে ৩০ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে।
ছেলেকে বাঁচাতে ব্যাংক লোন, এনজিও লোন এবং সুদে টাকা এনে ৩০ লক্ষ টাকা পরিশোধ করি। সর্বমোট ৫১ লক্ষ টাকা আমার কাছ থেকে বিভিন্নভাবে হাতিয়ে নেয় এমদাদ দালাল গং।
এত টাকা দেওয়ার পরও মাফিয়ারা আমার ছেলেকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করে ফেলে রেখে যায়। আমি দালালদের কাছে টাকা ফেরত চাইলে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে বলে, “টাকা নিতে পারলে নিয়ে নিস।” আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে আদালতে মামলা করলে দালালরা আমাদের পরিবারের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিনিয়ত হুমকি দিতে থাকে এবং পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করে হয়রানি করছে। আমি আইনের কাছে সঠিক বিচারের দাবি জানাই এবং দালালদের যথাযথ শাস্তির দাবি জানাই।
ভুক্তভোগী নুসরাত জাহান এনি বলেন, মেরাজ তালুকদার, মজিবর বেপারী, এসমোতারা, ফুলি বেগম ও পপি আক্তার—এরা সবাই এমদাদ দালালের সহযোগী। এরা আমার ছেলে শাহরিয়ার মাহমুদ তুষারকে ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে লিবিয়া হয়ে ২০ লক্ষ টাকায় ইতালি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে পাসপোর্টের সঙ্গে ১৬ লক্ষ টাকা নেয়। ১০ দিন পরে দুবাই নিয়ে লিবিয়ার কথা বলে বাকি ৪ লক্ষ টাকা নিয়ে যায় এবং আমার ছেলেকে লিবিয়ার দালালদের কাছে তুলে দেয়।
আমার ছেলেকে শারীরিক নির্যাতন করে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ভয়েস বার্তা পাঠিয়ে বলে ১৫ লক্ষ টাকা না দিলে তাকে মেরে ফেলবে। ছেলের জীবন বাঁচাতে গরু-বাছুরসহ সহায়-সম্বল সব বিক্রি করে ১৫ লক্ষ টাকা পাঠাই। ছেলেকে দেশে না পাঠিয়ে আবার নির্যাতন করে ২০ লক্ষ টাকা দাবি করে। ছেলের জীবন বাঁচাতে জমিজমা, স্বর্ণালংকার ও ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে ২০ লক্ষ টাকা পাঠাই। মোট ৫৫ লক্ষ টাকা নেওয়ার পর আমার ছেলেকে মুমূর্ষু অবস্থায় ফেলে রেখে যায়। পরে আমি অন্য লোকের মাধ্যমে আমার ছেলেকে উদ্ধার করে ইতালিতে পাঠাই। পুনরায় এমদাদ দালাল গংদের কাছে টাকা ফেরত চাইলে তারা অস্বীকার করে। এরপর আমি আদালতে মামলা করি। মামলা করার পর দালালরা আমার নামে মিথ্যা মামলা করে এবং পরিবারের সদস্যদের প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।
ভুক্তভোগীরা বলেন, আমরা আইনকে শ্রদ্ধা করি। আইনের কাছে আমাদের আবেদন—আমরা যেন সঠিক বিচার পাই। এমদাদ দালাল গংদের অতি দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচার করা হোক।
০৬/১২/২৫ সংবাদ সম্মেলন।
